সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে আসায় স্থানীয় প্রশাসন, ভূমি সংশ্লিষ্ট মহল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। স্বল্প বেতনের সরকারি চাকরির আড়ালে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন, অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তিনি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার তেলিনা এলাকায় জাকির হোসেনের নামে ও সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে একাধিক জমি ক্রয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব জমির প্রকৃত বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা হলেও দলিলে অনেক কম মূল্য দেখিয়ে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। একই এলাকায় মার্কেটসহ অতিরিক্ত জমি ক্রয়ের তথ্যও মিলেছে, যা তার ঘোষিত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুধু স্থাবর সম্পত্তিই নয়, তার ব্যক্তিগত জীবনযাপন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার, ঢাকায় উচ্চমূল্যের ফ্ল্যাটে বসবাস, সন্তানকে ব্যয়বহুল ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ানো—সব মিলিয়ে তার জীবনযাত্রা একজন উচ্চ আয়ের ব্যবসায়ীর সঙ্গে তুলনীয়।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি যোগদানের পর থেকেই সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এই সিন্ডিকেটে কিছু অসাধু দলিল লেখক, দালাল এবং অফিস সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জড়িত বলে দাবি উঠেছে। জমির শ্রেণী পরিবর্তন, ভুয়া মালিক তৈরি এবং জাল দলিল সম্পাদনের মাধ্যমে বিপুল অর্থ লেনদেন হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে ক্ষমতাসীন প্রভাব খাটিয়ে দলিল নিবন্ধনে অনিয়মের বিষয়টি বেশি আলোচিত। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ না করেই পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিলসহ বিভিন্ন নথি সম্পাদনে মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়া হচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করলে দলিল আটকে দেওয়া বা হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
এছাড়া সাভারের কিছু মৌজায় উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও গোপনে দলিল সম্পাদনের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ করা হয় এবং পুরো প্রক্রিয়াটি গোপনে সম্পন্ন করা হয়।
অফিসের ভেতরের পরিবেশ নিয়েও উঠেছে নানা অভিযোগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানিয়েছেন, অফিসে বহিরাগত প্রভাবশালী এক ব্যক্তির হস্তক্ষেপে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তার নির্দেশ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণ মানুষ সেবা নিতে এসে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। দলিল সম্পাদনের প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হচ্ছে, যা অনেকের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
এদিকে জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে, তার এবং তার স্ত্রীর হিসাব ঘেঁটে কোটি টাকার লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেন। তার দাবি, একটি স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তিনি বলেন, নিয়ম মেনেই দায়িত্ব পালন করছেন এবং রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
অন্যদিকে, অভিযোগ উঠেছে—সাংবাদিকরা এ বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গেলে তাদের হুমকি দেওয়া হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
এতসব অভিযোগের পরও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর তদন্ত না হওয়ায় জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
(চলবে)

