সাভার উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসের সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার “মোঃ আব্দুল লতিফ মল্লিক” এর বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ওপেন সিক্রেট ঘুষ বাণিজ্যের পাহাড়-সম অভিযোগ উঠেছে। জমির পর্চা সংশোধন, বিবাদীর খতিয়ান বহাল কিংবা বাদীর ন্যায্য দাবি, সব ক্ষেত্রেই মোটা অঙ্কের টাকা ছাড়া ফাইল নড়াতে চান না বা রায় লেখতে চান না তিনি। এমনকি সরকারি ‘ক’ তফসিলভুক্ত জমিও টাকার বিনিময়ে ব্যক্তির নামে রেকর্ড করে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
সরাসরি জমির মালিকদের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে সুবিধাজনক স্থানে ঘুষ লেনদেন করার কারনে ভুক্তভোগীদের কাছে এখন তার টেবিল মানেই ‘ঘুষ ছাড়া কোনো কথা নেই’।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আব্দুল লতিফ মল্লিকের মূল কর্মস্থল নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলায় হলেও অতিরিক্ত আয়ের আশায় সাভার উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসে সংযুক্তি ( অতিরিক্ত দায়িত্ব ) নিয়েছেন। এখানে এসে ৩০ ধারা মামলার শুনানিকে কেন্দ্র করে দু’হাতে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন তিনি। বর্তমানে সাভার অফিসে ‘বড় বরদেশী’ মৌজার প্রায় ৭৩৫ টি ৩০ ধারা মামলার কার্যক্রম তার কোর্টে চলমান রয়েছে । আর, এই মামলা গুলোকেই তিনি অর্থ আত্মসাৎ এর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।নিয়মের তোয়াক্কা না করে রাতেও চলে অফিস। সরেজমিনে দেখা যায়, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বিকেল ৪ টার মধ্যে অন্যান্য কোর্টের কার্যক্রম শেষ হলেও “আব্দুল লতিফ মল্লিক” আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সন্ধ্যা বা রাত পর্যন্ত অফিস করেন।
তথ্যমতে, লাখ টাকার নিচের লেনদেন গুলো অফিস সময়ের পর তার বিশ্বস্ত চক্রের মাধ্যমে ‘আলমনগর’ এলাকায় সম্পন্ন হয়। এই অবৈধ অর্থ লেনদেনের প্রধান সহযোগী হিসেবে লতিফ ও রুবেল নামের দুই বহিরাগত যুবকের নাম উঠে এসেছে। আর বড় অঙ্কের লেনদেনগুলো সম্পন্ন হয় ঢাকায় লতিফ মল্লিকের বা ভূমি মালিকের বিভিন্ন সুবিধাজনক স্থানে।
ভুক্তভোগীদের বোবাকান্না ও জিম্মিদশা দেখার বা বোঝার কেউ নেই এই আব্দুল লতিফ মল্লিকের কোর্টে !!
সবাই যেনো নিরুপায় উনার কাছে ।
সেবা প্রত্যাশীদের অভিযোগ, নিজেদের পৈত্রিক বা ক্রয়কৃত জমির রায় পেতে তারা এই কর্মকর্তার কাছে কার্যত জিম্মি। টাকা দিলে মুহূর্তেই জটিল ফাইল সোজা হয়ে যায়, আর টাকা না দিলে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়। শুনানির পরও রায় না লিখে ঝুলিয়ে রাখা তার নিয়মিত কৌশল।
ভূমি সেবা নিতে আসা বড় বরদেশী এলাকার এক বৃদ্ধ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন ”মাঠ পর্চা ও তসদিক আমার নামে হওয়া সত্ত্বেও, বাদী পক্ষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে লতিফ মল্লিক আমার জমি কর্তন করে দিয়েছেন।”
আরেক ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী জানান, তার নিজ নামে বিআরএস রেকর্ড করা জমিতে ৩০ ধারায় মামলা করা হয়। মামলার বাদী নিজে এসে ‘না দাবি’ (কোনো আপত্তি নেই) দেওয়ার পরও, খতিয়ান বহাল রাখার জন্য লতিফ মল্লিক তার (বিবাদী) কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন।
ভুক্তভোগী আরেক মহিলা কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, আমি গরু বিক্রি করে টাকা নিয়ে এসেছি, স্যার (লতিফ মল্লিক) বলতেছে “এই টাকায় কাজ হবেনা, যা বলছি তা নিয়ে আসেন, না হয় আপনার জমি টিকবেনা”।
আতঙ্কে অত্র কোর্টের অন্যান্য সহকর্মীরা মুখ খুলতে নারাজ। আব্দুল লতিফ মল্লিকের এই অনৈতিক বাণিজ্যের কারণে বড় বরদেশী মৌজার সাধারণ মানুষ ও প্রকৃত জমির মালিকেরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও তার ক্ষমতার দাপটে তটস্থ থাকেন। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে এই চক্রের অংশীদার হয়েছেন, আবার কেউ কেউ এ বিষয়ে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলতে তীব্র বিব্রতবোধ ও আতঙ্ক প্রকাশ করেছে।
তবে, স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীদের দাবি, এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার কারণে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। অনতিবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত সাপেক্ষ তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
(চলবে…)
আগামী পর্বে পড়ুন: সরকারি “ক” তফসিলের খতিয়ানের বিস্তারিত এবং চুনারচর মৌজার তসদিক পেতে লতিফ মল্লিকের দৌড়ঝাঁপের চাঞ্চল্যকর ফিরিস্তি।

