ঢাকার সাভার উপজেলার আমিনবাজারের উত্তর কাউন্দিয়া মৌজায় প্রায় ১ একর সরকারি খাস জমি জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যক্তি মালিকানায় নেওয়ার অভিযোগে পুরো ভূমি প্রশাসন প্রশ্নের মুখে পড়েছে। নথিপত্রে কারসাজি, রেকর্ড বইয়ের পাতা ছেঁড়া এবং জাল খতিয়ান ব্যবহার করে দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় জমিটি হাতিয়ে নেওয়া হয় বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশের পর প্রশাসন জমি উদ্ধার ও মামলা বাতিলের পদক্ষেপ নিলেও, এতে দায় এড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নদী ‘ডোবা’ হলো কীভাবে
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৮ সালে জরিপের সময় সি.এস ও আর.এস রেকর্ডে নদী হিসেবে থাকা জমিকে ‘ডোবা’ হিসেবে দেখানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, এটি ছিল পরিকল্পিত পদক্ষেপ—যার মাধ্যমে সরকারি জমি ব্যক্তির নামে নেওয়ার ভিত্তি তৈরি করা হয়।
জাল খতিয়ান দিয়ে মামলা
২০২১ সালে আপত্তি মামলা করার পর ২০২৩ সালে যাচাই-বাছাই ছাড়াই জমি ব্যক্তির নামে অন্তর্ভুক্ত করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালে ‘৩১৫/২৪’ নম্বর একটি মিস মামলা দায়ের করে একটি চক্র। এ সময় ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে ‘৯৮৮ নম্বর’ খতিয়ানের ভুয়া কপি উপস্থাপনের অভিযোগ উঠেছে।
রেকর্ড বইয়ের পাতা ছেঁড়া
ঘটনার অন্যতম গুরুতর দিক হলো—সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের দুটি পাতা ছেঁড়া পাওয়া গেছে।
ভূমি অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিষয়টি স্বীকার করলেও কীভাবে এটি ঘটেছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। এতে প্রমাণ গোপনের চেষ্টা ছিল কি না, সে প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্তে অসঙ্গতি, স্থানীয়দের ভিন্ন বক্তব্য
সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে জমি আবেদনকারীদের দখলে রয়েছে দাবি করা হলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তাদের মতে, এটি তুরাগ নদীর অংশ ছিল, যেখানে সম্প্রতি বালু ফেলে ভরাট করা হয়েছে। এতে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সহকারী কমিশনার (ভুমি) শাহাদাত হোসেন খান সাইনবোর্ড স্থাপন করে দখলকৃত জায়গাটি উদ্ধার করেছে। কিন্তু এইখানে উল্লেখ্য যে যারা নদী ভরাট করেছে তাদের কি শাস্তির আওতায় আনা হবে ? এবং ভরাটকৃত স্থান থেকে বালি সরানোর ব্যবস্থা করা হবে?
চূড়ান্তভাবে জমি হস্তান্তর
২০২৫ সালের মার্চে একটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জমিটি ব্যক্তির নামে হস্তান্তরের অভিযোগ রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা ও একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে, যা প্রশাসনের ভেতরের দুর্বলতা ও অনিয়মকে সামনে নিয়ে এসেছে।
সংবাদ প্রকাশের পর ‘তৎপরতা’
বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর প্রশাসন হঠাৎ সক্রিয় হয়ে ওঠে। সংশ্লিষ্ট মিস মামলার রায় বাতিল, জাল খতিয়ান অপসারণ এবং জমি পুনরুদ্ধারের পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এখনো নেওয়া হয়নি।
দায় এড়ানোর প্রবণতা?
বর্তমান সহকারী কমিশনার (ভূমি) দাবি করেছেন, ঘটনাটি তার দায়িত্ব গ্রহণের আগের।
তবে প্রশ্ন উঠছে—বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কি পুরো ঘটনার দায় এড়াতে পারেন? এবং কেন আগে এই অনিয়মগুলো নজরে আসেনি?
বড় প্রশ্ন
এই ঘটনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—
সরকারি রেকর্ডের পাতা কীভাবে ছেঁড়া হলো?
জাল খতিয়ান আদালতে উপস্থাপন হলেও তা শনাক্ত হলো না কেন?
সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে এখনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?
গণমাধ্যমে প্রকাশ না হলে কি জমি উদ্ধার হতো?

